Wednesday , February 17 2021
প্রবীণ - ফারহান উদ্দিন

প্রবীণ – ফারহান উদ্দীন

যাক বাবা, ১১৭ রানেই গুটিয়ে গেলো৷ টার্গেট মাত্র ২৩১ রান৷ ওয়ারিকানকে একটু দেখেশুনে খেললে অসম্ভব কিছু না৷ কমন রুমে কিছু উটকো ছেলেমেয়ে ঢুকেছে৷ খেলার মাঝখানে কী চায় এগুলো কে জানে!

– ম্যাম, আপনাদের সাথে আজকে আমরা সময় কাটাতে এসেছি৷ আপনার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলি? — না, আমি কারও সাথে কথা বলি না৷ আমি এখন খেলা দেখছি৷ – আচ্ছা, তাহলে আপনার সাথে একসাথে বসে খেলা দেখি আমরা?

— আমি তাহলে চলে যাবো, তোমরা দেখো৷ – স্যরি, ম্যাম৷ আপনি দেখেন, আমরা পরে আসবো৷ঝামেলাগুলো গেলো তাহলে! অপদার্থের দল করুণা করতে আসছে! মাঝে মাঝে আসে এরকম কিছু লোকজন, মনে করে বৃদ্ধাশ্রমে আমরা অনেক কষ্টে আছি৷

কীসের কষ্ট? আমি অনেক ভালো আছি! ওদের জন্য একাত্তরে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি, আর এরা আসে মাঝে মাঝে দয়া দেখাতে, কিছু একটা দিয়ে ছবি তুলে সেটা প্রচার করতে! আমার দরকার নাই এসব৷ যত্তোসব! আমি অনেক ভালো আছি!

টিভিটা একটু ঝাপসা হয়ে গেলো মনে হয়! নাকি চশমায় কিছু পড়লো? ওকি! সৌম্য আউট হয়ে গেলো নাকি৷ নাহ, ছেলেপেলেগুলোর সাথে এরকম না করলেও পারতাম৷ খারাপ লাগছে, এখন যদি ওরা আবার আসতো! একটা মিষ্টি মেয়ে কী সুন্দর একটা শাড়ি পরেছে৷ আমার ছোট নাতনীটাও শাড়ি পরলে এরকমই দেখাতো নিশ্চয়ই৷

টুকুনটাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে! চোখের কোণায় কি জল চলে এলো? নাহ, এত পথ পাড়ি দিয়ে এসেও এতটা আবেগপ্রবণ হলে তো চলবে না৷ আমি বীরাঙ্গনা, লড়াই করে এদেশটা স্বাধীন করেছি৷ কিন্তু, ইদানিং মনের বিরুদ্ধে জোর খাটাতে পারছি না৷ বয়েস হয়েছে তো, আর কত?

খালাম্মা, দরজা খুলেন৷ ওনারা আসছেন, আপনাদের জন্য খাবার নিয়া আসছেন৷ আয়ার কণ্ঠ এটা৷ সাথে মনে হয় ঐ ছেলেমেয়েগুলো এসেছে৷

— আয়, ভেতরে আয়৷- আসসালামু আলাইকুম, ম্যাম৷– তোরা বস, আমার সাথে খা৷- ম্যাম, আমরা ডিস্ট্রিবিউট করছি তো সব রুমে, আপনি খেয়ে নিন৷ আর ঘন্টাখানেক পরে নিচে কমন স্পেসে আসলে খুশি হবো৷ সবাই মিলে একটু গল্পগুজব করবো আর একটা কেক কাটবো৷

— হ্যাঁ, নিশ্চয়ই যাবো৷ তোরা আমাকে আরেকবার ডেকে নিয়ে যাস৷- ওকে, ম্যাম৷ছেলেটাকে দেখতে অনেকটা আমার রতনের মতো৷ আহ! চোখের সামনে রতনটা কীরকম বদলে গেলো৷ ভার্সিটি থেকে বেরুনোর সময় অব্দি ঠিক ছিলো৷ যেই না একটা বড় চাকুরি জুটে গেলো, অমনি অপাঙক্তেয় হয়ে গেলাম৷ হুটহাট করে বিয়ে করে ফেললো, তারপর তো আর কথাই নেই৷ থাক, এসব মনে করে আর কাজ কী!

ছেলেমেয়েগুলো বেলুন-টেলুন দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়েছে৷ সামনে টেবিলে একটা কেক রাখা৷ অন্যান্য প্রবীণরা চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেমেয়েগুলোর সাথে৷ প্রবীণদের চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে তারা অসম্ভব আনন্দ পাচ্ছে৷ এই বাচ্চাগুলো কি সেটা অনুধাবন করতে পারছে? কেক কাটার আগে ওরা কিছু কথা বললো৷ আচ্ছা, আজকে তাহলে ভালোবাসা দিবস! এই উপলক্ষে আমাদের সাথে সময় কাটাতে এসেছে৷

ভালোবাসার আবার দিবস কী? আমাদের সময় এইসব হাবিজাবি ছিলো না৷ তাও ভালো, একটা উপলক্ষে তো আসা হলো৷ছোট্ট একটা কেকের টুকরো, অথচ খেতে কী মজাটাই না লাগছে৷ মনে হচ্ছে এতে এক সাগর ভালোবাসা মাখিয়ে এনেছে! কেক খাওয়া হয়ে গেলে সবাই মিলে গান গাইলো৷ একটা ছেলে কী একটা মায়ের গান ধরলো৷

বারো বছর ধরে মনের ভেতর মেঘ জমেছে আমার৷ গানটা শুনে একটু একটু করে বৃষ্টি শুরু হচ্ছে! … মা যে দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধরিয়া করেছেন আমাদের ঋণীগায়ের চামড়া কাটিয়া দিলেওসেই ঋণ শোধ হবে না জানি …

বৃষ্টি বেশ ভালোরকমেই শুরু হয়েছে৷ কত কী মনে পড়ে গেলো! মা কে হারিয়েছি কত আগে মনেও নেই৷ মায়ের জন্য কখনো কাঁদি নি৷ আজ সেই মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে৷ কত বছর আগে শেষ কেঁদেছি, পাঁচ বছর? দশ বছর? কিছু মনে নেই৷

বুকের ভেতর জমে থাকা সব কষ্ট কান্নার সাথে যেন বের হয়ে যাচ্ছে৷ … সব কিছু আছে আগের মতোমা হারিয়ে গেলোএখন আর পথ চাইয়া আ আ আ … আহ!

একেবারে হৃদয়ের গভীরে গিয়ে লাগছে৷ আমি হু হু করে কাঁদছি৷ মনে হচ্ছে এই কান্না থামবে না৷ এই তিন চার মিনিটে সব স্মৃতিই চোখের সামনে ভেসে উঠলো৷ তুই কী শুনালি এটা! কী নাম তোর? আয়, এদিক আয়, তোকে একটু জড়িয়ে ধরবো৷ তোর কপালে একটা চুমু দিবো৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *